জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির স্বপ্ন পূূরন।

IMG-20210711-WA0011.jpg

ডেস্ক রিপোর্ট, ডেইলি সুন্দরবনঃ অনেক সাধনার পর অবশেষে জাতীয় দলের জার্সিতে শিরোপা জয়ের স্বাদ পেয়েছেন সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার লিওনেল মেসি। ৪৭তম কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্বপ্ন পূরণ করেছেন রেকর্ড সর্বোচ্চ ছয়বারের ফিফাসেরা তারকা। মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনারও দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপা খরার অবসান ঘটেছে। সেই ১৯৯৩ সালে শেষবার এই কোপাতেই ট্রফি জিতেছিল কিংবদন্তি দিয়াগো ম্যারাডোনার দেশ।

এবার দীর্ঘ ১৪ বছর পর দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ফাইনাল মহারণে মুখোমুখি হয়। ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোর বিখ্যাত মারাকানা স্টেডিয়ামে হলুদ-আকাশীর লড়াইয়ে ব্যবধান গড়ে দেন আর্জেন্টিনার এ্যাটাকিং মিডফিল্ডার এ্যাঞ্জেল ডি মারিয়া। বাংলাদেশ সময় রবিবার সকালে হওয়া ম্যাচের ২২ মিনিটে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার রেনান লোডি ও গোলরক্ষক এডারসনকে বোকা বানিয়ে দৃষ্টিনন্দন গোল করেন ফরাসী ক্লাব পিএসজিতে খেলা ৩৩ বছর বয়সী এই তারকা। শেষ পর্যন্ত ডি মারিয়ার গোলটিই ম্যাচের ব্যবধান গড়ে দেয়। আর আর্জেন্টিনার দীর্ঘ শিরোপা খরার অবসান হয়।

অনেকের মতে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে ডি মারিয়া খেলতে পারলে আর্জেন্টিনা হয়তো জার্মানিকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হতো। কিন্তু আলবিসেলেস্তাদের দুর্ভাগ্য, ইনজুরির কারণে ওই ফাইনাল মহারণ খেলতে পারেননি মারিয়া। যার মাসুলও আর্জেন্টিনাকে দিতে হয়েছিল ফাইনালে হৃদয়ভাঙ্গা হার দিয়ে। প্রকৃতির কি প্রতিদান। সাত বছর পর এবার সেই মারাকানাতেই ট্রফি জয়ের উল্লাস করেছেন মেসি-মারিয়ারা। যদিও বিশ্বকাপ জয়ের সঙ্গে এই ট্রফির তুলনা চলে না। কিন্তু যে দলটি দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ট্রফি জয়ের স্বাদ পেয়েছে তাদের কাছে এটা বিশ্বকাপের চেয়ে কোন অংশে কম নয়। এই ট্রফির মাহাত্ম্য যে কেমন সেটা ম্যাচ শেষে বোঝা গেছে গোটা আর্জেন্টিনার দলের বাঁধভাঙ্গা উল্লাসে।

স্বপ্নের শিরোপা জিতে আর্জেন্টিনার যেমন শাপমোচন হয়েছে তেমনি ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে গেছেন দলটির অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ক্লাব ফুটবলে এমন কোন শিরোপা নেই যা অন্তত তিনবার করে জেতেননি ক্ষুদে এই জাদুকর। বার্সিলোনার হয়ে এত বেশি ট্রফি জিতেছেন যে শোকেসে আর জায়গা হচ্ছে না! এরপরও মেসির মনের কোণে ছিল হাহাকার। জাতীয় দলের হয়ে অর্জনের থলি যে এতদিন শূন্য ছিল। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে সর্বকালের অন্যতম সেরাদের কাতারে নিজের নামটি লিখিয়েছেন আর্জেন্টাইন সুপারস্টার। কোপার সাফল্যের পর সময়ের সেরা ছাপিয়ে অনেকে মেসিকে রাখতে শুরু করেছেন সবসময়ের সেরাদের তালিকায়। তাদের মতে এখন থেকে মেসির নাম উচ্চারিত হবে সর্বকালের দুই সেরা ফুটবলার ব্রাজিলের পেলে ও আর্জেন্টিনার দিয়াগো ম্যারাডোনার সঙ্গে।

এর আগে দেশের হয়ে একটি বিশ্বকাপ ও তিনটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে খেলেছিলেন মেসি। এর মধ্যে ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ- প্রতিটি ফাইনালেই ফিরেছিলেন শূন্য হাতে। অনেক সাধনার পর এবার পেয়েছেন দু’হাত ভরে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে যে মাঠে (মারাকানা স্টেডিয়াম) হেরেছিলেন সেখানেই এবার জিতেছেন দেশের হয়ে প্রথম আন্তর্জাতিক শিরোপা। এই পথে মেসি জিতেছেন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল ও সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার গোল্ডন বুট। যে কারণে ধারণা করা হচ্ছে এবার সপ্তমবারের মতো ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলারও হতে চলেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

সবচেয়ে হতাশার ছিল ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ, ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকা, ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকা- পরপর তিন বছর তিনটি বড় আসরের ফাইনালে আর্জেন্টিনা হারলেও মেসি হয়েছিলেন আসরগুলোর সেরা খেলোয়াড়। দেশকে ট্রফি জেতাতে না পারা মেসির কাছে ব্যক্তিগত এসব অর্জনের কোন মূল্য ছিল না। যে কারণে টানা তিন ফাইনাল হারের হতাশায় ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডের বল গ্রহণ করেননি। শুধু তাই নয় তখন আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরও নিয়েছিলেন অভিমানে। কিন্তু গোটা দুনিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের ভালবাসা ও আর্জেন্টিনা ফুটবল এ্যাসোসিয়েশনের অনুরোধে অবসর ভেঙ্গে ওই বছরই ফিরে আসেন। যার প্রতিদান অবশেষে পেয়েছেন ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। স্বপ্নের শিরোপা জয়ের পর মেসি বলেন, ‘আমার মনে হয় ঈশ্বর আমার জন্য এই মুহূর্তটা জমিয়ে রেখেছিলেন। ব্রাজিলের মাটিতে তাদের হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় অসাধারণ অনুভূতি। জাতীয় দলের হয়ে কিছু জয় করা জরুরী ছিল। বেশ কয়েকবার আমি এর কাছাকাছি গিয়েছি। আমি জানতাম কখনও এটা হয়তো পাব না, আবার একসময় হয়তো পাব। আমার মনে হয় এরচেয়ে সেরা মুহূর্ত আর হতে পারে না।’ এবার মেসির চোখ আরও সুদূরে। সতীর্থদের নিয়ে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও গড়তে চান ইতিহাস।

চোট থাকার পরও দেশের প্রতি ভালবাসা আর দায়বদ্ধতা থেকে ফাইনালে খেলেছেন মেসি। এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টাইন কোচ লিওনেল স্কালোনি বলেন, ‘আপনারা যদি জানেন কোন অবস্থায় মেসি কোপা আমেরিকা খেলেছে। তাহলে তাকে আরও বেশি ভালবাসবেন। তাকে ছাড়া এসব হয় না। পুরো ফিট না হয়েও সে খেলে। যেমন ফাইনাল ম্যাচ ও আগের ম্যাচ।’ মেসির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কতটা গাঢ় সেটা জানিয়ে আর্জেন্টাইন বস বলেন, ‘ওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক আর দশটা কোচ-খেলোয়াড়ের মতো নয়। এটা আরও গভীর। আমরা পরস্পরকে শুভেচ্ছা জানাই। জড়িয়ে ধরি, সববিষয় খোলামেলা আলোচনা করি। ও যে দেশ ও সতীর্থদের জন্য কতটা নিবেদিতপ্রাণ সেটা আমার চেয়ে বেশি কেউ জানে না। মানুষ হিসেবে অসাধারণ মেসি খেলোয়াড় হিসেবে তো সর্বকালের সেরাদের একজন’।

আর্জেন্টিনার শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিয়ে ব্রাজিলের কোচ তিতে ফাইনাল নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। বর্ষীয়ান এই কোচ বলেন, ‘অবশ্যই শিরোপা হারিয়ে খারাপ লাগছে। আমার কাছে যেটা মনে হয় ম্যাচটা অনেক বেশি শরীরনির্ভর ছিল। নেতিবাচক ফুটবল হয়েছে। সবসময় ফাউল হয়েছে। রেফারিও বারবার বাঁশি বাজিয়েছেন। যে কারণে খেলায় কোন ছন্দ ছিল না।’ মেসির সঙ্গে নেইমারের গভীর বন্ধুত্বের বিষয়টি সবারই জানা। যে কারণে এবার স্বয়ং নেইমার চেয়েছিলেন তার প্রিয় বন্ধুর দল ফাইনালে খেলুক। তার সেই আশা পূরণ হয়েছে। ফাইনালে হেরে নিজে অঝোরে কাঁদলেও বন্ধু মেসির অর্জনে ঠিকই সাধুবাদ জানিয়েছেন। ফাইনাল শেষে মারাকানায় মেসিকে জড়িয়ে ধরে অঝোরে কেঁদেছেন নেইমার। এ বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন ব্রাজিল কোচ, ‘আমি এর আগেও বলেছি, খেলার মাঠে নেইমার ও মেসি প্রতিপক্ষ। কিন্তু শত্রু নয়। এমন দৃশ্য ফুটবলই আপনাদের দেখাবে। ফুটবলের সবচেয়ে বড় গুণ এটাই। খেলাটা আপনাকে খেলোয়াড়দের মানবিক দিকটাও দেখাবে। মেসি-নেইমারের ঘটনা আবারও সেটা প্রমাণ করেছে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

scroll to top